নিউজরুম ৭১॥ ভাষা সংশ্লিষ্ট এসব সমস্যার কোনো কোনোটি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি প্রতিসম রাষ্ট্র হওয়ায়, দেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত ভাষিক সমস্যাসমূহ প্রকটভাবে প্রতিভাত হচ্ছে না। সে জন্য দেশের জাতীয় নেতৃত্ব কোনো সময়ই ভাষা-পরিস্থিতিগত সমস্যাকে সমস্যা হিসাবে আমলে নিচ্ছে না

ভাষা-পরিস্থিতি সতত পরিবর্তনশীল। কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভাষা-পরিস্থিতি কখনও স্থির থাকে না। কিন্তু ভাষা-পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনুকূলেও ঘটতে পারে, আবার প্রতিকূলেও ঘটতে পারে। কোনো দেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন সূচীত হয়, তা যদি দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনুকূলে সংঘটিত হয় তাহলে তা হয় গ্রহণযোগ্য; আর যদি এ পরিবর্তন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে সংঘটিত হয় তাহলে তা হয় অগ্রহণযোগ্য। কারণ কোনো দেশের ভাষা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন, সে দেশে দীর্ঘমেয়াদী ভাষা-রাজনৈতিক অস্থিরতা বয়ে আনে।

বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের ছাপ সমাজ ও সংস্কৃতিতে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ইদানিং বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে এতোটাই নেতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যে— রীতিমতো তা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন যতোই যাচ্ছে, ততোই যেনো এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে ভাষা সংশ্লিষ্ট নানা সমস্যা। ভাষা সংশ্লিষ্ট এসব সমস্যার কোনো কোনোটি দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি প্রতিসম রাষ্ট্র হওয়ায়, দেশের ভাষা-পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত ভাষিক সমস্যাসমূহ প্রকটভাবে প্রতিভাত হচ্ছে না। সে জন্য দেশের জাতীয় নেতৃত্ব কোনো সময়ই ভাষা-পরিস্থিতিগত সমস্যাকে সমস্যা হিসাবে আমলে নিচ্ছে না।

পৃথিবীর দেশে দেশে ভাষা-পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তন জনিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা থেকে দেশকে সুরক্ষার লক্ষ্যে ভাষানীতি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক দেশেই নেতিবাচক ভাষা-পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে ভাষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বিপর্যস্ত ভাষা-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনুরূপ একটি ভাষানীতি প্রয়োজন। কারণ একটি জাতীয়তাবাদী ভাষানীতি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশ সরকার ভাষা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে এবং তা বাস্তবায়নের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং তা বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশ ভাষিক সমস্যা জনিত রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি পাবে। ভাষানীতি প্রণয়নে যে সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তা নিম্নে ৩টি ভিন্ন শিরোনামাধীনে তালিকাভুক্ত করে উপস্থাপন করা হলো-

জাতীয় জীবনে বিরাজিত ভাষা-পরিস্থিতি পরিবর্তনে করণীয়

১) বাস্তবে বা সামজিক ও গণমাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে লেখ্য ও বাচ্য সংজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূক করণ।

২) বাংলাদেশে অবস্থিত ও পরিচালিত সমস্ত প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষায় পরিচালনায় বাধ্যবাধকতা আরোপণ।

৩) আবাস, ভবন ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে বিদেশি ভাষায় আরোপিত নামের পরিবর্তে বাংলা ভাষায় নাম আরোপণ।

৪) বিজয় দিবস, ঈদ ও দূর্গাপূজার মতো জাতীয় দিবসগুলোতে বিদেশি ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ রাখতে বাধ্যতা আরোপণ।

৫) দেশের সমস্ত গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিদেশি ভাষায় প্রচারিত অনুষ্ঠান (সংবাদ ব্যতীত) সপ্তাহে ২ দিন বন্ধ রাখার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপণ।

৬) চাকরিতে নিয়োগে বাংলা বা বিদেশি ভাষায় প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা থাকা শর্ত আরোপণ। ইংরেজ TOEFL-এর অনুকরণে বাংলা ভাষার দক্ষতা নিরূপক ভাষাগত দক্ষতা মানক তৈরি করণ।

শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজিত ভাষা-পরিস্থিতি পরিবর্তনে করণীয়

১) উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বিদেশি ভাষা মাধ্যমে পরিচালিত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেমন-English Medium ও English version বন্ধ করণ।

২) দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সব ধরণের বিদেশি ভাষা শিক্ষা রহিত করণ।

৩) যেনো একজন শিক্ষার্থি বিভিন্ন বিদেশি ভাষা থেকে একটি বিদেশি ভাষা বাছাই করে শেখার সুযোগ থাকে, সে জন্য তৃতীয় শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে বিদেশি ভাষা পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করণ।

৪) ৮ম শ্রেণি থেকে বিদেশি ভাষায় এক-তৃতীয়াংশ বিষয় পাঠের ব্যবস্থাকরণ এবং এই শ্রেণি থেকে বাংলা ২য় পত্র এবং ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্র শিক্ষাক্রম থেকে বাদ দিয়ে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন।

৬) বাংলা ভাষা ও বিদেশি ভাষা শিক্ষক বা শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলা/বিদেশি ভাষার শিক্ষক নিয়োগে আন্তর্জাতিক মানের ভাষাগত দক্ষতা শর্তযুক্ত করণ।

৭) বিভিন্ন বিদেশি ভাষা (যেমন-চীনা ভাষা, জার্মান ভাষা ও ইংরেজি ভাষা) মাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করণ এবং সে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ও শিক্ষার্থী ভর্তিতে আন্তর্জাতিক মানের ভাষাগত দক্ষতা শর্তযুক্তকরণ।

শাস্ত্র ও জ্ঞান চর্চা সহায়ক ভাষা-পরিস্থিতি সৃজনে করণীয়

১) ধ্রুপদী ভাষা, আধুনিক ভাষা ও বিদেশি ভাষা থেকে অনুবাদের জন্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও জাতীয় মহাফেজখানায় শত শত নবায়নযোগ্য দুই বছর মেয়াদি (স্থায়ী পদে যোগদানের পর অনুবাদের দায়িত্বটি এড়িয়ে যেতে পারে, তাই ২ বছর মেয়াদী হওয়া বাঞ্ছনীয়) অনুবাদকের পদ সৃষ্টিকরণ।

২) বাঙ্গালি জাতির বিশ্রুতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফার্সি, বর্মী ও তিব্বতি ইত্যাদি ধ্রুপদী ভাষায় লিখিত পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি ও বইপত্র বাংলায় অনুবাদকরণ।

৩) বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় লিখিত বিশ্বের নামীদামী গ্রন্থ বৎসরে কমপক্ষে ১০০ খানা হারে অনুবাদকরণ।

প্রস্তাবিত উক্ত করণীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে, বাংলাদেশে বিরাজিত বিপর্যস্ত ভাষা-পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং বিপর্যস্ত ভাষা-পরিস্থিতিজনিত কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য ভাষা-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে।

ড. এ.বি.এম. রেজাউল করিম ফকির; অধ্যাপক, জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি; পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *