টক শো সাংবাদিকতা বনাম হিরো আলম

নিউজরুম ৭১॥ কয়েকদিন হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে প্রচারিত টক শো-র কিছু অংশ ভাইরাল হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপক।

এই টক শো তে অংশগ্রহণকারী অতিথি ছিলেন আশরাফুল হোসেন আলম। আমরা যাকে হিরো আলম নামে চিনি। সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে সম্প্রতি তিনি একটি দল থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। এতেই তার ডাক পড়েছিল টক শোতে।

খেয়াল করুন টক শোর কথাবার্তায়। উপস্থাপিকার প্রশ্ন। আপনার মনে হয়, ‍একজন সাংসদ হওয়ার মতো সকল যোগ্যতা আপনার আছে?

এই প্রশ্নে সকল যোগ্যতা বলতে আসলে কী বোঝাতে চাইছেন উপস্থাপিকা? নির্বাচনে অংশ নিতে প্রার্থীর যে যোগ্যতা সুনির্দিষ্ট করে দেয়া রয়েছে সেটি? তা বোঝাতে তো সকল শব্দটির দরকার হয় না। আর প্রশ্নকর্তা যদি মনে করেন এর বাইরে আরো যোগ্যতা লাগে-সেখানেই প্রশ্ন।সেখানেই বিভাজন-বিভক্তি।

আপনি ব্যক্তিগতভাবে বলতেই পারেন, অমুকের কথাবার্তা শুদ্ধ নয়। শিক্ষা-দীক্ষায় তেমন নয়। সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা ছেলে। তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে মানাবে না, যায় না…ইত্যাদি। আরো অনেক কিছুই বলতে পারেন। কিন্তু এই টক শোর প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছে সংসদ সদস্য হতে হলে কথায় আঞ্চলিকতার টান থাকা যাবে না, আরো কিছু অতিরিক্ত গুণাবলি বা যোগ্যতা থাকতে হবে যা সংবিধান ঠিক করে দেয়নি। সংবিধানের কোথাও কি বলা আছে যে, সংসদ সদস্য হতে গেলে আঞ্চলিকতার টান থাকা যাবে না? হিরো আলমের মতো লোকেরা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না? একটি দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম নেয়া ব্যক্তিকে কখনোই এইভাবে প্রশ্ন করা সমুচীন বোধ করি না অন্তত মূলধারার গণমাধ্যমে। এতে প্রতিভাত হয় সমাজের এলিট শ্রেণিকেই আসতে হবে রাজনীতির ময়দানে। মনে রাখতে হবে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করা আর গণমাধমে পাবলিকলি উত্তর চাওয়ার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।  গণমাধ্যম কি জানতে চাচ্ছে, কীভাবে জানতে চাচ্ছে, যিনি সঞ্চালকের ভূমিকা রাখছেন তার শব্দ চয়ন থেকে শুরু করে ভাষা-প্রয়োগের বিষয়টিও অডিয়েন্স খেয়াল করেন। তাই রাষ্ট্র কর্তৃক টানা সীমারেখা অতিক্রম করছেন কী-না  তা শনাক্তকরণ কঠিন কিছু নয়।

অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারী অতিথি হিরো আলম প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছেন সেটি খেয়াল করি। তিনি বলেছেন স্বপ্ন সবাই দেখে। তার স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? এছাড়াও তিনি উত্তর দিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ক্রিকেটার মাশরাফি, গায়িকা মমতাজের কথা উদাহরণ টেনেছেন। হিরো আলম তো ঠিকই বলেছেন। স্বপ্ন ছাড়া কোন মানুষটা জীবনে এগিয়ে গিয়েছেন? বড় হতে হলে স্বপ্ন তো দেখতেই হবে।

আর এরকম স্বপ্নবাজ তরূণদেরই দরকার বাংলাদেশের। যারা নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে পিছ পা হয় না। পাছে লোকে কিছু বলে –এই ভয়ে মুখ লুকায় না।

উপস্থাপিকা হিরো আলমকে জিজ্ঞাসা করছেন, মাশরাফি স্বপ্ন দেখলে আপনিও দেখতে পারেন কিনা, বিষয়টি কি এরকম?

এটা কী ধরনের জিজ্ঞাসা? এর চেয়ে ভয়ঙ্কর, অবমাননাকর, শ্রেণি-বিদ্বেষী প্রশ্ন আর কী হতে পারে? একটা মানুষ..তিনি তার স্বপ্ন দেখতে পারবেন বা পারেন কী-না সেবিষয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। স্বপ্ন-দেখার যোগ্যতা বিষয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। অন্যের সঙ্গে তুলনাও দেয়া হচ্ছে।তাহলে বিষয়টি কী দাড়ায় ?

উত্তর দাতাকে দেখানো হচ্ছে আপনি শ্রেণিচ্যুত, আপনার অধিকার নেই সংসদ সদস্য হওয়ার। এমনকি আপনি স্বপ্নও দেখতে পারেন না সংসদ সদস্য হতে পারার। এই প্রশ্নটির বৃহত্তর পরিসরে মানুষের অপার সম্ভাবনা, অধিকার ও যোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। সর্বোপরি মনুষ্যত্বকে হেয় করা।

মাশরাফি এখন পযর্ন্ত বাংলাদেশের প্রায় সবার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। আমি নিজেও তার ভক্ত। আমি তার কথা এখানে টানছি না। টক শোর প্রশ্নকর্তা যদি অন্য কারো উদাহরণও টেনে আনতেন তারপরও মানুষ প্রশ্নে হিরো আলম ও জনঅধিকার বিষয়ে একই কথা খাটে।

হিরো আলম কিন্তু উতরে গেছেন। সঠিক জবাবটি তিনি দিয়েছেন। হ্যা, তিনিও স্বপ্ন দেখতে পারেন। সাংবিধানিকভাবেই প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সেখানে একজন নাগরিক হিসেবে তিনি সংসদে গিয়ে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখতেই পারেন। অন্য কারো সাথে বিষয়টি তুলনা করা মূল্যহীন, অথহীন।

টক শোর পরের প্রশ্নটা করা হয়েছে এভাবে- আপনি মনে করেন, সংসদ ভবনটা মজা করার জায়গা?

আসলেই কী সংসদ বা সংসদ ভবন মজা করার জায়গা?  উত্তর ’না’ হলে প্রশ্নটা আসলো কেন? যারা বতমানে সংসদ সদস্য রয়েছেন, উনারা কি মজা করতে সেখানে গিয়েছেন? যদি তারা সেখানে মজা করার উদ্দেশ্যে না-ই যান, তাহলে আপনার কেন মনে হলো হিরো আলম মজা করতে সংসদে যেতে যাচ্ছেন?

বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের ধারা পারমিট করলে যেকোন পেশার মানুষই নাগরিকদের ভোটে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেতে পারেন।কিন্তু তাই বলে এটা ভাবা ঠিক হবে না যে, জোকস বলা যার পেশা তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে সংসদে গিয়ে সবাইকে হাসি-তামাশায় মত্ত রাখবেন। ভাড়ামো করবেন।

শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বে এ রকম নজির অগণিত যেখানে নানা-শ্রেণি-পেশার মানুষ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের হয়ে কথা বলতে সংশিষ্ট দেশের পার্লামেন্ট বা প্রতিনিধি সভায় গেছেন।

হিরো আলম উত্তর দিতে গিয়ে প্রশ্নকারীকে উল্টো জিজ্ঞাসা করেছেন, মজা কারা করেন বলেন তো? আবার তিনি নিজের উঠে আসার বিষয়ে বললেন তারা কি আমাকে দেখেছে আমি কোন জায়গা থেকে কতদূর এসেছি? তার মানে হিরো আলম বিষয়টি মজার হিসেবে নেন নি। সংসদে যা্ওয়ার বিষয়টি তো নই-ই। জীবনটা আসলেই চ্যালেঞ্জের। তা তিনি ভালো করেই জানেন। জীবনের পরতে পরতে বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তার পক্ষে এত দূর আসা আর সেই সঙ্গে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ-হাটাকে অন্যের চোখে বিষয়টি ’মজার’ মেনে নেননি তিনি। তাই আবারো জিজ্ঞাসা হিরো আলমের- আমার চেহারা যদি মাশরাফির মতো স্মার্ট হতো, ৭ ফুট লম্বা হইতাম তাহলে কিন্তু কেউ মজা করতো না।

আসলেই তাই। সমাজের চলমান প্রতিচ্ছবি হিরো আলম ধরতে পেরেছেন। উত্তর দিতে গিয়ে আরো একটি মোক্ষম প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। জিজ্ঞাস্য তার-  যোগ্যতা কয়জনের কয় জায়গায় আছে, যোগ্য ব্যক্তি সবাই আছে সংসদে?

আসলেই কী যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায় আছে? হিরো আলমের প্রশ্নকে এড়ানো যায় না সেখানে। উপস্থাপিকা কিছুটা খেই হারিয়ে স্বগোতোক্তির মতো বলেন, আমাদেরই সেটা ব্যথর্তা। তাহলে এই দ্বান্দ্বিক প্রশ্ন কেন?

আরেকটি প্রশ্নের উত্তর-বিশ্লেষণ দিয়েই শেষ করবো। হিরো আলমকে প্রশ্ন করা হয়েছে- জাতীয় সংসদের মতো একটা জায়গায় আপনার মতো মানুষ মনোনয়নপত্র কেনা মানে যারা বড় রাজনীতিবিদ, যারা আসলে দেশকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চান তাদের জন্য একটু্ খানি খারাপ লাগা তৈরি হতে পারে এটা আপনার মনে হয়নি?

প্রশ্নটি হতবাক করে দেয়, স্তম্ভিত হয়ে যাই। যারা বড় রাজনীতিবিদ, দেশকে তারা একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চান। সবই ঠিক আছে, আমরাও সেটা চাই। অবশ্যই উনারা সম্মানিত এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগামী। কিন্তু টক শোর উপস্থাপকের প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছে শুধু বড় রাজনীতিবিদরাই যোগ্য? অন্যেরা কি যোগ্য নন? নাগরিক নন? তাদের কি সম্মান নেই?  অবদান নেই সমাজ-রাষ্ট্রে? তাদের কি যোগ্যতর হয়ে ওঠার সুযোগ নেই? সংবিধান কি সমানাধিকার দেয়নি?

অন্যের একটু খানি খারাপ লাগা আমলে নিয়ে নিজের অধিকার, ভালোলাগা, অবদান রাখার সুযোগকে বন্ধ করার কথা বলছেন, বিবেচনায় নিতে বলছেন? এটা অন্যায্য। মানুষ সেখানেই মানুষ হয়ে উঠে যেখানে সুযোগ থাকে অবারিত।

সঠিক তথ্য তুলে আনতে সাংবাদিকতায় টক শোতে নানান ধরনের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। প্রায় সারা বিশ্বেই এটা প্রচলিত। অনেক সময় সরাসরি স্পর্শকাতর প্রশ্নে ‍বিব্রত হন টক শোতে অংশগ্রহণকারীরা। বিবিসি’র ’হাডর্ টক’ অনুষ্ঠানে বিশ্বের বাঘা বাঘা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, সংস্থা প্রধানেরা প্রশ্নের জালে নাকানিচুবানি খান। কিন্তু সেই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এবং প্রশ্নের ধরণগুলো কাউকে হেয় করার জন্য নয়, মৌলিক অধিকার খর্ব হয় সেরকম নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে জেইনাব বাডাইয়ের সঞ্চালনায় চলতি বছরের অক্টোবর মাসে বিবিসির ’হার্ড টক’ অনুষ্ঠানে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক সরকার প্রধান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় অনেক বিষয়ে। তার মধ্য মাহাথিরের জন্য কিছুটা বিব্রতকর প্রশ্ন যেমন- ১৯৯৮ সালে তার মন্ত্রিসভা থেকে উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে বরখাস্ত করার বিষয়টিও ছিল। কীভাবে প্রশ্নটি করছেন সেটিও গুরুত্বপর্ণ।

কাউকে আঘাত করার জন্য নয়। নিবন্ধটি লেখার উদ্দেশ্য একটাই। দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ-বাস্তবতায় সঠিক সাংবাদিকতা বড় চ্যালেঞ্জ। গণমানুষের কথা বলবার জন্যই গণমাধ্যম। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে কিছু উপস্থাপনকেই সাংবাদিকতা বলে না। সেক্ষেত্রে অডিয়েন্সের কাছে ভুল বার্তা চলে যায়। তৃণমূলের সমস্যা-সম্ভাবনাকে তুলে এনে পজিটিভ বাংলাদেশ বিনিমার্ণে একটা বড় ভূমিকার জায়গা রয়েছে গণমাধ্যমের। সেটি কাজে লাগাতে পারলে মূলধারার গণমাধ্যমের একটা দায় শোধ হবে। সেক্ষেত্রে প্রো-পিপল সাংবাদিকতাকে বেছে নেয়াটাই বিষয়টির এথিকস।

বতর্মানে যারা সাংবাদিকতা করছেন বা ভবিষ্যতে সংবাদকর্মীর কাজ করবেন অথবা সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের জন্য এই টক শোর আলোচনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সাংবাদিকতা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ আধেয় বিশ্লেষণ ডিসকোর্স হতে পারে।

লেখক: জাহিদুর রহমান, সাংবাদিক।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *