নিজের কারখানায় কর্মরত খোকন কারিগর

নিউজরুম সেভেন্টিওয়ান ॥  গদ বাধা জীবন কখনোই টানেনি তাকে, স্বাধীন জীবনযাপনে ছিলো যতো আগ্রহ। বন্ধুদের সাথে আড্ডা ঘুরাঘুরি করেই কেটেছে তার শৈশব। কিন্তু ভিন্ন কিছু দেখলেই দাঁড়িয়ে যেতেন প্রবল আগ্রহে, মন দিয়ে চেষ্টা করতেন শেখার।  বলছি ঢাকার অদূরে সাভারে বেড়ে ওঠা মৃৎশিল্পী খোকন করিগরের কথা। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় খোকন। পড়াশোনায় খুব খারাপও ছিলেন না,  বিএসসি শেষ করে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে । বাবা-মা চাইতেন ছেলে চাকরি করে সংসারের হাল ধরুক। কিন্তু খোকন নিয়মতান্ত্রিক জীবনের বাইরে মুক্ত পাখির মতো খোলা আকাশে উড়তে চান। নদীর মতো বয়ে যেতে চান দূর বহু দূর। মুক্তস্বাধীন জীবনের মোহাবিষ্ট যেন এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা! স্বপ্নের পিছনে ছুটতে ছুটতেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের এতগুলো বছর। পিতৃপ্রদত্ত নামের মতো বদলে ফেলেছেন জীবনের অনেক কিছুই। চারু-কারুশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত কারুশিল্পী খোকন কারিগর! নিজের মেধা, মনন আর অধ্যাবসায়ের সুনিপুণ মিথষ্ক্রিয়ায় কাদামাটি আর কাঠ দিয়ে  তৈরি তার পণ্য আজ স্থান পায় সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের ড্রয়িং রুম থেকে শোবার ঘরে।

জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে উপভোগ করতে চেয়েছেন প্রকৃতি আর জীবন থেকেই। মেলায় বনসাই দেখে আগ্রহ হয়েছিলো বনসাই বানানোর, ছুটেছেন বিভিন্ন জায়গায়। সংগ্রহ করেছেন বটগাছ। গাছ লাগাতে প্রয়োজন টব। তাই নিজেই টব বানানোর উদ্যোগ নেন। মাটি নিয়ে কাজ করার হাতেখড়ি রাজশাহী চারুকলা থেকে আসা মৃৎশিল্পী হিরা ভাইয়ের হাত ধরে (যিনি বর্তমানে ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন আর্ট কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল)। এসময় সংগে পেলেন দুই বন্ধু রোকন আর বাবু’কে । দিনরাত মাটির তৈরি জিনিস বনানো, পুড়ানো, শিল্পের ছোয়া দেয়া এসব নিয়েই কেটে যাচ্ছিল সময় ।

তবে স্বপ্নের পেছনে নিরন্তর ছুটে চলার এই পথ মসৃন ছিল না মোটেই। প্রতিটি বাকেই এসেছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। জীবন কখনো কখনো নিষ্ঠুর বাস্তবতা নিয়ে এসে দাড়িয়েছে সামনে। জীবন সংগ্রামের আজন্ম লড়াকু এই শিল্পী দমে যাননি কখনো। ঝড়ে পড়েছেন বারবার কিন্তু ঝরে পড়েননি। বাবার অবসরের পর সংসার চালানোর দ্বায়িত্ত্ব এসে পড়ে কাঁধে। এর মাঝে হিরা ভাইও হঠাৎ করে চলে গেলেন। বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আর পেশাগত জীবনের টানে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লেন। কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছিলেন না খোকন কারিগর। অবশেষে বাবার ইচ্ছায় যোগদান করেন একটি গার্মেন্টসে। কিন্তু খোকনের মন পড়ে রইলো কাঁদা মাটিতেই।

মাত্র একমাস চাকরি করেই তিনি বুঝে গেলেন এই পরাধীন জীবন তার জন্য নয়!  চাকরি ছেড়ে দিয়ে সোজা বাড়ীতে চলে আসেন তিনি। বাবা-মাকে জানিয়ে দিলেন চাকরি নয়, মৃৎশিল্পী হতে চান।

নিউজরুম সেভেন্টিওয়ানের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে খোকন বলেন “খুব কঠিন ছিলো সে সময়টা। সমাজের লোকজন মুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মাটির জিনিস বানানো ভালোভাবে নেয়নি। তারা বলতেন আমি ধর্মান্তরিত হয়েছি,পাল হয়ে গেছি।”

তাই বলে দমে যাননি খোকন, কাজ করেছেন ভালোবাসা থেকে ভালোলাগা থেকে। গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান “মৃন্ময়”। মৃন্ময়ে নিজেদের তৈরি পোড়া মাটির বিভিন্ন পণ্য গিফট আইটেমের দোকানে সরবরাহ করতে লাগলেন । এ সম্পর্কে খোকন বলেন, “ঐ সময় ঢাকা চারুকলার শিক্ষক স্বপন শিকদার স্যার আমাদের কাজ দেখতে এসেছিলেন এবং নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটা আমার অনেক কাজে লেগেছে। নিয়মিতভাবেই স্যার পরামর্শ-উৎসাহ এখনো দিয়ে যাচ্ছেন।”

খোকন কারিগর আরও জানান, মাটি নিয়ে যে গবেষনার বিষয় আছে, কোন মাটি ভালো কোনটা খারাপ, মাটি কিভাবে তৈরি করতে হয়, কিভাবে ভালো খামির করতে হয়, হুইল ঘুরিয়ে মাটির পট বানানো- তা স্বপন শিকদার স্যারই প্রথম শিখিয়েছিলেন।

কিন্তু চাকুরীজীবী বাবা বা গৃহীনি মা- কারোরই ছেলের এই কাজ ভালো লাগেনি। ছেলেকে সংসারমুখী করতে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন বাবা-মা। মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়ন, পারিবারিক চাপ আর মায়ের হঠাৎ করে ভয়ানক অসুস্থতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন খোকন। ছেড়েই দিতে চেয়েছিলেন মৃৎশিল্পের কাজ। এ সময় মৃৎশিল্পী মরণচাঁদ স্যারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে খোকন বলেন, স্যারের একটি কথা আজও কানে বাজে, “কাজ কর কাজের মধ্যে থাকো, একদিন মুঠ করে মাটি দিলেও মানুষ তা তোমার কাছ থেকে কিনবে।”

এই কথাটি বদলে দেয় খোকন কারিগরের জীবন। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাননি। শত বাধা পেরিয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত কাজ করে যচ্ছেন শুধু ভালোবাসার জায়গা থেকে ।আর এই দীর্ঘ পথচলায় তার সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে আজো পাশে আছেন তার সহধর্মীনি । খোকন নিউজরুম সেভেন্টিওয়ানকে বলেন “আমার কারিগর হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার ও কষ্ট করেছে আমার বউ মাসুদা আক্তার। খুব অভাব অনটনের দিনগুলোতেও হাসিমুখে উৎসাহ দিয়ে গেছে।আমি যদি কোনদিন সত্যিকারের কারিগর হতে পারি তা কেবল তার প্রবল উৎসাহ,সমর্থন আর সহযোগীতার জন্য।”

খোকন কারিগর জানান, এখন তার ছোট কারখানাতে নানা রকমের কাজ হয়, কয়েকজন বেতনভূক্ত সহকারী আছেন। দোকানে বা শো-রুমে সরবরাহের পাশাপাশি ফেসবুক পেজ থেকে অনলাইনেও নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে মৃন্ময়ের পণ্য।( https://www.facebook.com/mrinmoycraft/ )

 

 

মৃৎশিল্পী হিসেবে কাজ করে আফসোস হয় কিনা জানতে চাইলে খোকন বলেন “জীবনে আফসোস বলতে আমার মা আমাকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে পারেননি, আর কোন আফসোস নেই। জীবনের প্রতিটি মূর্হূতকে উপভোগ করতে চাই।”

এই মৃৎশিল্পী আরও বলেন, “ব্যাক্তি পর্যায়ে সরকারের সহযোগীতার দরকার নেই, দরকার মৃৎশিল্পের ভালো বাজার তৈরির। ভালো বাজার তৈরি করতে সরকার সহায়তা করলে  মৃৎশিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের উন্নতি করতে পারবে।”

খোকন মনে করেন বর্তমানে গার্মেনটস শিল্প যেমন দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছে, সঠিক পরিকল্পনা আর সহযোগীতা পেলে মৃৎশিল্পিরাও তা পারবেন। কারণ মৃৎশিল্পের কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হয় না।

 

স্বপ্নচারী ভিন্ন ধারার এই মানুষটি মানুষের মাঝেই জীবনের সকল আনন্দের উৎস খুঁজে পান। তাইতো সময় পেলেই সাইকেল নিয়ে ছুটে যান গ্রাম বাংলার মানুষের জীবণের রূপ দেখতে। ঘুরে বেড়ান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। হয়ত সঙ্গী হিসেবে থাকে ছোট বেলার সেই বন্ধুরা কিংবা পরিচিত যে কেউ। তিনি বলেন, “এটা আমার মনের খোরাক। জীবনটাকে উপলব্ধি করতে চাই প্রতিটি মূহূর্তে। যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্বেই রয়েছে আলাদা আলাদা আনন্দ, সাতন্ত্র্য সৌন্দর্য।  এই প্রতিটি পর্ব আমি উপভোগ করতে চাই। অপঘাতে অকাল মৃত্যু চাই না! বুড়ো হয়ে মরতে চাই। ”

নিজের করা কাজ দেখছেন শিল্পী খোকন কারিগর

এছাড়াও মানুষের উপকারের জন্য কাজ করে বেড়ান এই মৃৎশিল্পী। হাসপাতালে আসা কারো রক্তের প্রয়োজন হলে বিনা পয়সায় যোগাড় করে দেন। শিল্পীর চেয়ে নিজেকে একজন কারিগর হিসেবে পরিচয় দিতে বেশী সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন খোকন। শিল্পের ছোয়ায় একজন গুণী শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

 

মাহফুজুল আমিন

(বিশেষ প্রতিবেদক)

বিশেষ কৃতজ্ঞতা :মৃন্ময় রোকন ।

 

২ Comments

  1. অসাধারণ…… 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *