করোনায় স্বস্তি, স্বাস্থ্যসেবায় অব্যবস্থা এবং আইনে অপ্রতুলতা - নিউজরুম ৭১ | বাংলা নিউজ
মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০১:১০ পূর্বাহ্ন
নোটিশ :
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিউজরুম ৭১ (Newsroom71.com) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি । জেলা প্রতিনিধি এবং রিপোর্টার পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহী প্রার্থীরা ইমেইলে সিভি পাঠাতে পারবেন newsroom71online@gmail.com ঠিকানায়।

করোনায় স্বস্তি, স্বাস্থ্যসেবায় অব্যবস্থা এবং আইনে অপ্রতুলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

করোনাকালে করোনার সংক্রমণ হল। কঠোর লকডাউন। বের হওয়া বারণ ছিল। দীর্ঘসময় গৃহে অন্তরীণ থাকতে হয়েছে। ঘরে নামাজ-কালাম করে আর টিভির পর্দায় চোখ রেখেই মূলতঃ সময় পার করতে হয়েছে। সেল ফোনে প্রতিনয়ত জিজ্ঞাসা, ‘কেমন আছো’। জবাব, ‘আল্লার রহমতে এখনো বেঁচে আছি।’

করোনা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। মৃত্যু কমেছে। করোনার প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ কমেছে। শ্রমিকরা কারখানায়। অফিস-আদালত আবার সচল হয়েছে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের আগমন ও কলকাকলিতে আবারো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে। সেই সাথে ভয়-ভীতি-উৎকন্ঠাও কমেছে। সামাজিক দূরত্ব কমেছে। নৈকট্য বেড়েছে। দেখা-শোনা, মেলা-মেশা হচ্ছে। জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক। সে সুবাদে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার একটি সার্বিক চিত্র পর্যবেক্ষণের সুযোগও হয়েছে। সাথে বিগত ৫০/৬০ বছরের চিকিৎসাব্যবস্থার অনেক চিত্রই যেনো স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠছিল। জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষ্ময়কর উন্নতি আরো অনেক দেশের মত বাংলাদেশকেও ছুঁয়েছে।

শৈশবে মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বলতে কেবল সেকেলে এক্সরেযন্ত্র, থার্মোমিটার, স্টেথোসকোপ এবং রক্তচাপ মাপার যন্ত্র দেখেছি। সকল রোগে কিছু টেবলেটসহ বোতলে কাগজের লেবেল সাঁটানো মিকচার দেয়া হতো। হাসপাতাল ও ডিসপেনসারিতে কম্পাউন্ডারের পদ ছিল। বোতল ঝাকি দিয়ে লেবেল মেপে মিকচার ঢেলে খেতে হতো। চোখে ছানি পড়লে ছানি অপসারণ শেষেও ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মত মোটা কাঁচের চশমা পরিধান করতে হতো। এখন লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। সেসময় বড় ডাক্তার মানে এলএমএফ এবং এমবিবিএস। আজ এলএমএফ, এমবিবিএস নেই বললেই চলে। প্রায় সবাই বিভিন্ন বিশেষায়িত বিষয়ে উচ্চতর এফসিপিএস, এমএস, এফআরসিএস, এমআরসিপি ইত্যাদি ডিগ্রিধারী। সেসময় শহরাঞ্চলে ৯৫% রোগীই সরকারীব্যবস্থায় চিকিৎসা নিতেন।

অধুনা চাকচিক্যময় অনেক বেসরকারী হাসপাতাল গড়ে উঠেছে।পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। সিটিস্ক্যান, এমআরআই, ডিজিটাল এক্সরে, ডপলার, ম্যামোগ্রাফ, আলট্রাসনোসহ অজস্র আরো কত কি। চিকিৎসায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ হচ্ছে যেমন, ল্যাসিক, ফ্যাকো, ল্যাপারোস্কপি, এন্ডোসকপি, হার্ট বাইপাস ও ট্রান্সপ্ল্যান্ট, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট, বোনগ্র্যাফটিং ইত্যাদি। ১৯৬০সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় কোটি। সেসময় এলএমএফ-এমবিবিএস মিলিয়ে চিকিৎসক ছিলেন আনুমানিক তিনহাজার। আজ জনসংখ্যা সতের কোটি, চিকিৎসক আশি হাজারের অধিক। চিকিৎসাসেবার মান, সুবিধাদি ও পরিসরও বেড়েছে বহুগুণ। চিকিৎসকদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব বেড়েছে। পরিশ্রমও করেন তাঁরা অক্লান্ত-নিরলস, দিনভর-রাতভর। অজস্র রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। নতুন নতুন কার্যকর ঔষধ ও টিকা উদ্ভাবনের কারণে বিগত শতকের সেই ভয়াভয় গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, পোলিও, যক্ষা,ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি অসংখ্য রোগ আজ প্রায় নেই বললেই চলে।

পাশাপাশি চুরি-চামারি, দুর্নীতি ও অনৈতিকতার বিষয়টি উপেক্ষনীয় নয়। চিকিৎসাশাস্ত্র, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সেবা ও ব্যবসায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিৎসার মানবিক পেশায় অনৈতিকতার অভিযোগও ব্যাপক। বড় বড় বেসরকারী বাণিজ্যিক হাসপাতালগুলোতে গেলেই রোগীকে বেডে ভর্তি করানোর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় অধিক উপার্জনের কৌশল হিসেবে । বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিকে প্রসুতী মায়েদের তড়িঘড়ি করে সিজারিয়ান করিয়ে প্রসব করানোর অভিযোগ রয়েছে। নিকট অতীতে অনেক বিশিষ্ট চিকিৎসক ছিলেন যারা মুনাফান্বেষী বাণিজ্যিক হাসপাতালের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেননা। চ্যাম্বার-প্র্যাকটিস করতেন। অনেক চিকিৎসক রোগী দেখে পারতপক্ষে দু/একটার বেশি ঔষধ লিখতেননা। বিষয়টা অনেক রোগীর কাছেই অপন্দনীয় ছিল। ভাবতেন, চিকিৎসক অভিজ্ঞ নন। আজকাল চিকিৎসকরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ৫/১০ টা ঔষধ, এন্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেন। রোগীরা তাতে খুৃশি হন। কারণ, তাৎক্ষণিক ম্যাজিকের মত কাজ হয়। ফলে পেশা রূপান্তরিত হয় লাভের নেশায়। উদ্ভাবিত হয় ধাপ্পাবাজির বিবিধ কৌশল।

নামিদামি অনেক হাসপাতাল ভর্তি হওয়া রোগীদের থেকে বিভিন্ন অনৈতিক কৌশলে আকাশচুম্বী বিল করে প্রচুর অর্থ আদায় করে থাকে। ব্যয়বহুল অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন ল্যাব-টেষ্ট, মৃত্যুর পরও রোগিকে ভেন্টিলেশন বা আইসিইউতে কয়েকদিন আটকে রেখে বাড়তি বিল করা, হৃদযন্ত্রে রিং না পরিয়েই বিল করা, কিডনি ও পিত্তথলির পাথর অপসারণ না করেই বিল করা, ব্যবহৃত হয়নি এমন সব ব্যয়বহুল ঔষধের উল্লেখ করে বিল করা, এমন অজস্র সব অভিযোগ শোনা যায়। এতসব অভিযোগ সর্বাংশে সত্য না হলেও, সর্বাংশে অসত্য নয়। চিকিৎসা হবে মূলতঃ সেবার পেশা। সাথে ব্যবসাটা হবে নিয়ন্ত্রিত। ইউরোপ-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা পেশা আইন ও বিধি-বিধান দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ঔষধ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আইন থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আজঅব্দি কোনো আইন হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিনস্থ দপ্তরগুলো সংবৎসর ব্যস্ত থাকে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল কেনাকাটায়। এমন দিন যায় না যেদিন খবরের কাগজে মেডিকেল সামগ্রী ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অদক্ষতা ও ব্যর্থতার খবর প্রকাশ হয় না। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারী ও সিন্ডিকেটের কারণে অর্জিত সফলতা ম্লান হয়ে যায়। কেনাকাটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবাদে চিকিৎসাসেবায় অর্জিত সফলতা সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণের অভাবে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এজন্য আইন ও বিধি-বিধান প্রয়োজন। কিন্তÍু সে উদ্যোগ নেই। সেই ১৯৪০ সালে ড্রাগস এ্যাক্ট প্রণীত হয়েছিল। ৪২ বছর পর সে একই আইন, সামান্য হেরফের করে, আগের আইনটি রহিত না করেই, পুন:প্রণয়ন করা হল ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ নামে। মেডিকেল ডিভাইস বা চিকিৎসা উপকরণ বিষয়ে আজঅব্দি কোনো আইনই হয়নি। স্বাস্থ্য সেবা বিশেষত বেসরকারী খাতের স্বাস্থ্য সেবার মান ও নীতি-নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যকর কোনো আইন নেই। মেডিকেল এবং ডেন্টাল কাউন্সিল এ্যাক্ট, ১৯৮০ এবং ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিজ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ আজ অনেকটাই অকার্যকর। ব্যক্তি চিকিৎসক বা ক্লিনিকের ক্ষেত্রে খানিকটা প্রযোজ্য হলেও বাণিজ্যিক হাসপাতাল এবং সেখানে উচ্চ বেতনে কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কার্যতঃ সম্ভব নয়। সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক কি কি সেবা দিবে, উহাদের দায়িত্বসমূহ, সেবাগ্রহিতাদের অধিকারসমূহ, প্রতারণা-অনৈতিকতার ব্যক্তি দণ্ড, করপোরেট দণ্ড, হাসপাতাল/ক্লিনিকের মান,পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি আইনে নির্ধারণ করা থাকবে।

কোভিড-১৯ (করোনা) শতাব্দির সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মহামারি। এর ছোবল থেকে বিশ্ব এখনো মুক্ত নয়। চলছে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের নিরন্তর প্রচেষ্টা। এবিষয়ে বাংলাদেশে অর্জিত সফলতাকে খাটো করে দেখা যাবে না। সরকারের নেতৃত্বে নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারী কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যগণ এবং আরো সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত প্রয়াস ছিল। সুযোগ ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিরলস পরিশ্রম ও দক্ষতার সাথে কোভিড মোকাবেলা করা হয়েছে। এরপরও সার্বিক স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থা, অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়েও প্রচুর লেখা-লেখি ও সমালোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। আইনের অপ্রতুলতা স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞগণের সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ ও বিশ্লেষণ এবং, সেবা-গ্রহিতাসহ, সকল স্টেকহোল্ডাদের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা করে একটি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপক-ভিত্তিক একটি আইন দ্রুত প্রণীত হওয়া প্রয়োজন। বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন হতে পারে অথবা একই আইনে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় সন্নিবেশিত হতে পারে। সর্বোপরি আইনটি প্রয়োগের জন্য একটি উপযুক্ত কমিশন তথা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্ত্তৃপক্ষ প্রয়োজন। দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের নীতি-সহায়তা ও সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বর্ধিত ও সংহত করে বিশ্বমানে উন্নীত করা হলে জনগণের আস্থা, বিশ^াস ও নির্ভরশীলতা পূর্ণমাত্রায় বর্ধিত হবে। চিকিৎসাসেবা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হোক। চিকিৎসাপেশা মানবিকতা গুণে মহিমান্বিত হোক।

কাজী হাবিবুল আউয়াল , প্রাক্তন সিনিয়র সচিব

নিউজরুম৭১ এর সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, নিউজরুম৭১ কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার নিউজরুম৭১ নিবে না।)

সম্পর্কিত

© ২০২২ | নিউজরুম ৭১ কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত |

 
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com